সৈয়দ আব্দুল আজিজ মিলাদ
আধুনিক বিদ্যুৎ প্রযুক্তির প্রসারের ফলে কুপী/হারিকেন এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে কিন্তু ২০২৬ সালের এই এপ্রিল যেন আদিম যুগের হারিকেন কুপী নিয়ে হাজির হয়েছে। প্রকৃতি যখন রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে, তখন সাধারণ মানুষের জীবন বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। একদিকে অসহনীয় গরম, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং—সব মিলিয়ে জনজীবন আজ হাপিত্যেশ। বিশেষ করে দেশের কৃষক সমাজ আজ যে সংকটে পড়েছে, তা কেবল দুঃখজনকই নয়, বরং শঙ্কার। সেচের অভাবে আবাদ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের আগামীর খাদ্য নিরাপত্তায়।
বর্তমান বিএনপি সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনায়, তখন বিদ্যুৎ খাতের এই নাজুক দশা আমাদের অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। তথ্য বলছে, আমাদের গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে ২৮,৯১৯ মেগাওয়াট। অথচ এই ভরা মৌসুমে চাহিদা যখন ১৬,০০০ থেকে ১৮,০০০ মেগাওয়াটের ঘরে, তখন আমরা উৎপাদন করতে পারছি মাত্র ১৪,০০০ মেগাওয়াটের আশেপাশে। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, সক্ষমতা থাকার পরও কেন এই অন্ধকার?
বিদ্যুৎ সংকটের একটি বড় কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি। ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর ফলে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু কেবল বাইরের দোহাই দিয়ে কি দায় এড়ানো সম্ভব?
প্রকৃতপক্ষে, আমরা এক দীর্ঘমেয়াদী ভুল পরিকল্পনার মাশুল দিচ্ছি। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে যে তোড়জোড় ছিল, সেখানে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল চরমভাবে উপেক্ষিত। নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনে জোর না দিয়ে আমদানিকৃত এলএনজি ও কয়লার ওপর অতি-নির্ভরশীলতা আজ আমাদের এই খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এছাড়া, হাজার হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কেন্দ্র ভাড়া দেওয়ার মডেলটি এখন সরকারের ওপর এক বিশাল আর্থিক বোঝা। ডলার সংকটের কারণে বকেয়া বিল পরিশোধ করতে না পারায় আদানি বা এসএস পাওয়ারের মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আংশিক বা পূর্ণ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। প্রায় ৩৩টিরও বেশি কেন্দ্র আজ জ্বালানির অভাবে অচল।
বিএনপি সরকারের ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সেই বিদ্যুৎ সংকটের দুঃসহ স্মৃতি এখনো মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। ২০২৬ সালেও এসে কেন আমাদের একই চক্রে ফিরতে হলো, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ রয়েছে। ইকুয়াল রাইটস ইন্টারন্যাশনাল (ERI) এর পক্ষ থেকে আমরা সবসময়ই মানুষের মৌলিক অধিকার ও সমবণ্টনের কথা বলে আসছি। বিদ্যুৎ আজ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ জ্বালানি আমদানিতে বৈষম্য এবং অদূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে আজ সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা অধিকারবঞ্চিত।
সরকারকে বুঝতে হবে, কেবল সক্ষমতা বাড়িয়ে লাভ নেই যদি সেই সক্ষমতা ব্যবহারের জন্য জ্বালানি নিশ্চিত করা না যায়। স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে জ্বালানি কেনার ক্ষণস্থায়ী চিন্তা বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি চুক্তি এবং নিজস্ব খনিজ সম্পদ উত্তোলনে সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, বৈশ্বিক যুদ্ধের উত্তাপ আর অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার চাপে জনরোষ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।
আমরা চাই না অন্ধকারের এই পুনরাবৃত্তি। সরকার দ্রুত জ্বালানি সংকটের সমাধান করে কৃষি ও জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে—এটাই এখন সময়ের দাবি।
লেখক:
মানবাধিকার কর্মী
সৈয়দ আব্দুল আজিজ মিলাদ
Email: syedmilad9@gmail.com

