বাংলাদেশে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা আজ এক চরম সংকটের মুখে। গত দেড় মাসে হাম ও হামের উপসর্গে ২৫১ জন শিশুর মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক ভয়াবহ ব্যর্থতার দলিল। যেখানে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান হামকে একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেখানে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিদিন শিশুদের এই মৃত্যুমিছিল কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা ও বর্তমান চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ই মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ২০৯ জন এবং আক্রান্ত হয়ে ৪২ জন শিশু মারা গেছে। দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপের অভাব দৃশ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন হাসপাতালগুলোতে ভিড় বাড়ছে, অথচ শিশুদের জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থাগুলো থমকে আছে।
টিকা কেন দেওয়া হলো না: গাফলতি কাদের?
হামের টিকা (MR Vaccine) নিয়মিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) অংশ। ২৫১টি শিশুর মৃত্যু প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই গাফলতির মূলে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যথাযথ তদারকির অভাব এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার অক্ষমতা।
প্রশ্ন উঠছে—টিকা কি মজুত ছিল না, নাকি মাঠপর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্বেগ সত্ত্বেও কেন বড় ধরনের কোনো ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করা গেল না? এর দায় সরাসরি স্বাস্থ্য প্রশাসনের ওপর বর্তায়, যারা মহামারি শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি।
দায় কার: ড. ইউনূস সরকার না বর্তমান বিএনপি সরকার?
রাজনৈতিক ক্ষমতার এই পালাবদলের সন্ধিক্ষণে দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে এই পরিস্থিতি চললেও বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে তিন মাসের কাছাকাছি। অর্থাৎ, প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছিল ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে।
যেহেতু ১৫ই মার্চ থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যু শুরু হয়েছিল, সেহেতু প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক ধাক্কা সামলানোর এবং টিকাদান কর্মসূচি সচল রাখার মূল দায়িত্ব ছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। এই সংকট যখন দানা বাঁধছিল, তখন প্রশাসনিক মনোযোগের অভাব বা স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার না দেওয়াটা ছিল এক বড় ধরনের ভুল। ড. ইউনূসের সরকার এই দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না, কারণ তাদের মেয়াদেই সংক্রমণটি জটিল আকার ধারণ করতে শুরু করেছিল।
বর্তমান বিএনপি সরকারের দায়: গত দুই মাস ধরে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। দুই মাস আগের প্রাদুর্ভাব এখন বর্তমানে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত শনিবারও একদিনে ১১ জন শিশুর মৃত্যু প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকারও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সংকট হলেও, গত এক মাসে বিশেষ কোনো স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা বা গণ-টিকাদান কর্মসূচি শুরু না করাটা বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক স্থবিরতাকেই নির্দেশ করে।
মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমরা মনে করি, প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্র কর্তৃক অবহেলার একটি করুণ উদাহরণ। রাজনৈতিক ডামাডোলে শিশুদের জীবন এভাবে তুচ্ছ হতে পারে না। ইউনুস সরকার বা বর্তমান বিএনপি সরকার—কেউই এই দায় থেকে মুক্ত নন। দোষারোপের রাজনীতি না করে জনগণের জীবন রক্ষাই এখন হওয়া উচিত সরকারের প্রথম কাজ।
আমাদের দাবি পরিষ্কার:
অবিলম্বে সারা দেশে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ হাম টিকাদান অভিযান শুরু করতে হবে।
টিকাদান কর্মসূচিতে গাফলতির জন্য দায়ী স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত স্বাস্থ্য নীতিমালা সংস্কার করতে হবে।
শিশুদের জীবন কোনো রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি নয়। আমরা চাই না আর কোনো মা তার শিশুকে হামের মতো সাধারণ রোগে হারাক।
লেখক:
মানবাধিকার কর্মী
সৈয়দ আব্দুল আজিজ মিলাদ
Email: syedmilad9@gmail.com

