​চব্বিশের জুলাই বিপ্লব ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব বাঁক পরিবর্তন। ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত এই অভ্যুত্থান কেবল একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের এক নতুন ‘জুলাই সনদ’ বা ম্যান্ডেট জাতির সামনে হাজির করেছিল। কিন্তু ক্ষমতার গন্ধ নাকে আসতেই রাজপথের একসময়ের লড়াকু দল বিএনপির বর্তমান ভূমিকা জনমনে হাজারো প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা—বিএনপি কি বিপ্লবের চেতনা ধারণ করছে, নাকি কৌশলে পুরনো ব্যবস্থাকেই ফিরিয়ে আনতে চাইছে?

​জুলাই সনদ বাস্তবায়নে টালবাহানা কেন?

​জুলাই বিপ্লবের মূল দাবি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল সংস্কার এবং ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলুপ্তি। বিএনপি শুরুতে এই দাবিকে সমর্থন জানালেও বর্তমানে তাদের মূল মনোযোগ কেবল দ্রুত নির্বাচনের দিকে। সংস্কারের চেয়ে ক্ষমতায় আরোহণই যেন তাদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এমন এক ধারণা প্রচার করছে যে, নির্বাচনই সব সমস্যার সমাধান। অথচ জুলাই সনদের সারমর্ম ছিল—রাষ্ট্র সংস্কার না করে নির্বাচনে গেলে আবারও সেই পুরোনো স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। বিএনপির এই অনড় অবস্থান মূলত জুলাই বিপ্লবের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যকে পাশ কাটানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

​গুম-খুনের অধ্যাদেশ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

​সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথকে সংকুচিত করার প্রবণতা। গত ১৫ বছরের আর্তনাদ ছিল আয়নাঘর আর গুমের বিচার। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো নিয়ে এক ধরনের রহস্যময় ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, কেন এই বিচারিক প্রক্রিয়াগুলোকে গতিশীল করার পরিবর্তে ধীরলয়ে চালানো হচ্ছে? বিএনপি কি পর্দার আড়ালে কোনো আপসকামিতার পথে হাঁটছে? যদি গুম-খুনের হোতাদের বিচার নিশ্চিত না করা হয়, তবে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তস্নাত ইতিহাস কলঙ্কিত হবে।

​আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে কার স্বার্থ?

​জনগণের মুখে এখন বড় প্রশ্ন—বিএনপি কেন আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করতে এতোটা আগ্রহী? যে দলটি কয়েক মাস আগে পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী শাসনের হোতা ছিল, তাদের রাজনৈতিকভাবে স্পেস দেওয়ার মাধ্যমে বিএনপি হয়তো একটি ‘সেফ এক্সিট’ নিশ্চিত করতে চাইছে। অনেকেই মনে করছেন, বড় দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই সমঝোতা আসলে একে অপরকে রক্ষা করার পুরনো রাজনীতিরই অংশ। আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না করা বা তাদের অপরাধীদের ধরপাকড়ে শৈথিল্য প্রদর্শন জনগণের আকাঙ্ক্ষার সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

​বিএনপি আসলে কী চায়?

​বিএনপির বর্তমান কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, তারা চায়:

​ক্ষমতার দ্রুত পালাবদল: রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে তারা গদিতে বসাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।

​পুরনো দ্বি-দলীয় কাঠামো: তারা চায় রাজনীতি যেন আবারও বিএনপি-আওয়ামী লীগ বলয়েই সীমাবদ্ধ থাকে, যাতে তৃতীয় কোনো শক্তি বা ছাত্র-জনতার নতুন কোনো প্ল্যাটফর্ম দাঁড়াতে না পারে।

​আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ: বিপ্লবের চেতনার চেয়ে প্রশাসনের পুরনো কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই তাদের বর্তমান লক্ষ্য।

​এনসিপি ও জামায়াতের অবস্থান

​এই পরিস্থিতিতে দেশের অন্যান্য প্রধান শক্তিগুলোর অবস্থান বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। জামায়াতে ইসলামী জুলাই বিপ্লবের শুরু থেকেই রাজপথে সক্রিয় ছিল এবং তারা রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে তুলনামূলক কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। তারা আওয়ামী লীগের সরাসরি বিচার এবং সংস্কার সম্পন্ন না করে নির্বাচনের বিপক্ষে জনমত গঠন করছে। অন্যদিকে, এনসিপি এবং অন্যান্য সমমনা দলগুলো একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের দাবিতে সোচ্চার। তারা মনে করে, বিএনপি যদি তাদের এই টালবাহানা বন্ধ না করে, তবে জনগণ আবারও রাজপথে নামতে দ্বিধা করবে না।

​উপসংহার

জুলাই বিপ্লব কোনো দলের ক্ষমতা দখলের সিঁড়ি ছিল না; এটি ছিল ব্যবস্থার পরিবর্তনের লড়াই। বিএনপি যদি জনগণের এই আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন বা সংস্কারে অনীহা দেখায়, তবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে তাদেরও সময় লাগবে না। শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানি করার অধিকার কারো নেই।

​ লেখক:

মানবাধিকার কর্মী

সৈয়দ আব্দুল আজিজ মিলাদ

Email: syedmilad9@gmail.com

 

Share.

Leave A Reply

Exit mobile version